Home / কবুতরের রোগ ও চিকিৎসা / কবুতরের সালমোনেলা রোগের কারণ, লক্ষণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা
কবুতরের স্যালমোনিলা রোগের কারণ, লক্ষণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা
কবুতরের স্যালমোনিলা রোগের কারণ, লক্ষণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা

কবুতরের সালমোনেলা রোগের কারণ, লক্ষণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা

সালমোনেলা নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট হয়। টাইফয়েড জাতীয় মৃদু জ্বর ভিন্ন জীবাণু দ্বারা ঘাঁটিত। এটি খুবই সাধারণ এবং খুবই ব্যাপক রোগ। সাধারণত এটি গ্রাম-ঋণাত্মক(Gram Negative) ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা ঘটিত হয়। পৃথক অঙ্গ অনুযায়ী লক্ষণ প্রকাশিত হয় । এই রোগ বাচ্চা কবুতরের জন্য মরণশীল এবং এটি খুব দ্রুত চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে. জীবাণুগুলো খাদ্য, পানি, বায়ু এবং ডিমের মাধ্যমে অন্য পায়রা মধ্যে সংক্রমিত হয় এবং তাদের অন্ত্রে পৌঁছানোর মাধ্যমে প্রধানত প্রভাবিত হয়। এই রোগকে বলা হয় ৮০ রোগের জন্মদাতা, তাই এই রোগ হলে তাড়াতাড়ি নির্মূলের ব্যাবস্থা করা উচিৎ।

কারনঃ
১) বুনো পায়রা সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে ।
২) জুতা বা পায়ের পাতার নিচের অংশে সংক্রমিত ধুলোর মাধ্যমে ।
৩) তীক্ষ্ণদন্ত প্রাণী দ্বারা সংক্রমিত হয়(যেমন ইঁদুর), এটি সংক্রামক জীব দ্বারাও এ রোগ উত্পাদিত হতে পারে।
৪) খাদ্য বিষক্রিয়াগত কারনে, দূষিত মাটি বা জল থেকে, তেলাপোকা বা খাদ্য থেকে বা আক্রান্ত একটি প্রাণীর থেকে খাদ্য খাওয়া, লালা, বায়ু, কাশি ইত্যাদি থেকেও হতে পারে।





৫) নতুন পায়রা খামারে প্রবর্তনের মাধ্যমে হতে পারে।
৬) সংক্রমিত মলের মাধ্যমে সংক্রমিত হতে পারে।
৭) সংক্রামক এজেন্ট (যিনি খাদ্য সরবরাহ করেন বা খামার রক্ষক এর মাধ্যমে) তিনি যদি তার পরিছন্নতার ব্যাপারে উদাসিন থাকেন তাহলে এই রোগ ছড়াতে পারে।
৮) বাইরের পাখি খামারে অবাধ প্রবেশ বা খামারের কবুতর বাইরের কবুতরের সংস্পর্শে ।
৯)খামার পানির পাত্রে পায়খানা করলে সেই পানি যথা সময়ে না সরিয়ে নিলে সেই পানি পান করলে এই রোগ ছড়াবে।
১০) সরাসরি ট্যাঁপ/নদী পুকুর বা জীবাণু যুক্ত পানি সরবরাহ করলে।

লক্ষণঃ

সাল্মনিল্লা গুরুতরভাবে আক্রান্ত পাখি শরীরের সর্বত্র দেখা যাবে। তাই এর উপসর্গও বিভিন্ন রকম হতে পারে-

১) গাড় সবুজ পায়খানা বা সবুজ ও সাদা পায়খানা বা পাতলা সবুজ বা পাতলা সবুজ ও সাদা পায়খানা।(অথবা সবুজাভ মল, আমাশয় ভাব, সবুজাভ পাতলা মল)
২) অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক পাখি কিছুটা শিথিল হয়ে যাবে ও দ্রুত ওজন কমে যাবে ও বুকের হাড্ডি বের হয়ে যাবে।
৩) পায়ের সন্ধি/জয়েন্ট বা পায়ে ফুলে যেতে পারে।
৪) গরূৎ বা গরল boils হতে পারে যা কবুতরের গায়ে ফোস্কা বা ফোড়া বা গতার মত দেখা যেতে পারে।
৫) বমি ভাব বা বমি করবে। খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে খাঁচার এককোণে চুপ করে লোম ফুলিয়ে বা এক পা উচু করে অথবা গায়ে মুখ গুঁজে বসে থাকবে।
৬) প্রাথমিক অবস্থাই চিকিৎসা না করলে ঘার বাকা বা টাল রোগ হতে পারে। এটিকে অনেকেই রানিখেত বা PMV রোগ বলে যা আদৌ সঠিক না।
৭) বাচ্চা কবুতর প্রায়ই শ্বাস সমস্যা দেখা দিতে পারে বা ডিম ফুটার পরে দ্বিতীয় সপ্তাহ আগে বাচ্চা মারা যেতে পারে অথবা ডিমের মধ্যে মৃত্যুর আরেকটি উপসর্গ হতে পারে।




অথবা অনুউর্বর ডিম। এই রোগে ভিটামিন D শোষিত হয় না। তাই পাতলা চামড়ার ডিম বা চাম ডিমও পাড়তে পারে।
৮) এই রোগে বা অবস্থায় খাদ্য থেকে পুষ্টি না পেয়ে কবুতর দিন দিন খুব দুর্বল হয়ে মারা যেতে পারে ।
৯) কবুতরের পাখা ঝূলে যেতে পারে, ঝিমানো,খাদ্য না খাওয়া, দ্রুত চিকিৎসা না করলে ৪/৫ দিনের মধ্যে কবুতর মারা যেতে পারে ।

প্রতিরোধ:

১)সামান্য পটাশ বা লবন মিশ্রিত পানিতে কেনা খাবার ভালো করে ধুয়ে এরপর রোদে শুকিয়ে এরপর পরেবেশন করতে হবে।অথবা যদি খাবার পুনরায় ব্যাবহার করতে হয় তাহলে হালকা করে গরম করে পরিবেশন করতে হবে।

২) আপনার খামারে ফিল্টার পানি বা টিউব ওয়েল এর পানি ব্যাবহার করতে পারলে ভাল। এছাড়া পানি ফুটিয়েও সরবরাহ করা যেতে পারে খামারে।
৩)ইঁদুর/তেলাপোকা/মাছি বা কোন অবাঞ্ছিত কোণ দর্শক(মেহমান) থেকে আপনার খামার রক্ষা করতে হবে। যদি কোন আগন্তক আপনার খামার পরিদর্শন করতে চায় তাহলে আগে জুতা বা স্যান্ডেল খুলে রাখুন খামারের ভিতরের স্যান্ডেল ব্যাবহার করতে দিন। তার আগে হাত ও শরীর স্প্রে করে নিন ভাল করে।

৪)খাদ্য ও পানির পাত্র সঠিকভাবে পরিস্কার করুন প্রতিদিন।,কারণ পানি অনেকদিন পাত্রে রাখার জন্য এক ধরণের পাতলা মীঊকাশ/ঝীল্লী পড়ে যা সালমোনেলা জন্য অন্যতম কারণ বা দায়ী।
৫) আপনার খামার বা খাঁচা বা এলাকা পারলে প্রতিদিন না হলে নিদেনপক্ষে সপ্তাহে ২/৩ দিন পরিষ্কার করুন।
৬) আপনার খামার বা খাঁচা বা আশপাশের এলাকা প্রতিদিন বা নিদেনপক্ষে সপ্তাহে ২/৩ দিন অ্যান্টি জীবাণু মুক্ত স্প্রে করুন ।




৭) প্রাথমিক চিকিৎসা বা প্রতিরোধ এর ক্ষেত্রেঃ শাফি+ফেবনিল+মারবেলাস(হামদারদ) ২+২+১ টেবিল চামচ করে এই অনুপাতে ১ লিটার বিশুদ্ধ খাবার পানিতে মিশিয়ে সাধারণ ভাবে পরিবেশন করতে হবে প্রতি মাসে ৪-৫ দিন ।
৮) যারা ৭ নং ঔষধ যোগাড়ে ব্যর্থ হয়েছেন তারা হোমিও বাপ্তাসিয়া ৩০, ১ সিসি ১ লিটার বিশুদ্ধ খাবার পানিতে মিশিয়ে সাধারণ ভাবে পরিবেশন করতে হবে ৪-৫ দিন।
৯)অ্যাপেল সিডার(আমেরিকার তৈরি) মাসে ২ দিন ১ সিসি ১ লিটার বিশুদ্ধ খাবার পানিতে মিশিয়ে সাধারণ ভাবে পরিবেশন করতে হবে।
১০) রসুন বাঁটা ১ লিটার পানিতে ২ চা চামচ মিক্স করে এক লিটার বিশুদ্ধ খাবার পানিতে মিশিয়ে ছেকে সাধারণ ভাবে পরিবেশন করতে হবে মাসে ১-২ দিন।
১১) লেবুর রস পানির সাথে মিক্স করে সাধারণ ভাবে পরিবেশন করতে হবে মাসে ১-২ দিন।(এর পরিমান যেন সহনীয় হয় একটু লবনও মিক্স করে নিতে পারেন।)

১২) নিয়মিত ভিটামিন “কে”, “বি” ও “ডি” খামারে সরবরাহ করতে হবে মাসে ৪-৫ দিন
প্রয়োগ করতে হবে।


প্রতিকার বা চিকিৎসা ব্যাবস্থাঃ

১) রোগের আধিক্য এর ক্ষেত্রে Doxivet ১ গ্রাম+ফ্লাযিল সিরাপ ১ মিলি+১ গ্রাম Vet স্যালাইন= ৫ সিসি পানিতে মিশিয়ে হাতে ধরে খাওয়াতে হবে,দিনে তিন বার করে,৩-৪ দিন। খাবার যদি নিজে না খায় তাহলে আটা পানিতে গুলে হাতে ধরে খাওয়াতে হবে বা রাইস স্যালাইন ৫ সিসি করে দিনে ৩ বার দিতে হবে। ঔষধ খাওয়ানোর ১ ঘণ্টা আগে।কোন প্রকার শক্ত খাবার না দিয়া ভাল এতে খাবার হজম না হবার সম্ভাবনা বেশী থাকে। ফলে পাকস্থলী সংক্রমন হতে পারে।




২) রোগ যদি ৩ দিনের মধ্যে আরোগ্য না হয় বা পায়খানা রঙ যদি ২ দিনের মধ্যে পরিবত্তন না হয় তাহলে “অরাসিন কে সাস্পেন্সন”(Orasin K suspension বা Penicillin Group suspension) এর যেকোনো ঔষধ প্রয়োগ করা যেতে পারে। সাস্পেন্সন নিয়ম অনুযায়ী মিক্স করে ১ মিঃ গ্রাম/সিসি পরিমান Orasin K +ফ্লাযিল সিরাপ ১ মিলি+১ গ্রাম Vet স্যালাইন= ৫ সিসি পানিতে মিশিয়ে হাতে ধরে খাওয়াতে হবে,দিনে তিন বার করে,৩-৪ দিন।
৩) রোগ যদি ৩ দিনের মধ্যে আরোগ্য না হয় বা পায়খানা রঙ যদি ২ দিনের মধ্যে পরিবত্তন না হয় তাহলে “অরাসিন কে suspension(Orasin K suspension বা Penicillin Group suspension) এর যেকোনো ঔষধ প্রয়োগ করা যেতে পারে। সাস্পেন্সন নিয়ম অনুযায়ী মিক্স করে ১ মিঃ গ্রাম/সিসি পরিমান সরাসরি হাতে ধরে খাওয়াতে হবে,দিনে তিন বার করে ২ দিন সাথে রাইস স্যালাইন ৫ সিসি করে দিনে ৩ বার দিতে হবে।

সতর্কতা:

১) প্রথমে হাত ভালো করে ধোয়া বা হেক্সিসল বা অন্য কোনো অ্যান্টি জীবাণু মুক্ত ঔষধ স্প্রে করা বা গ্লাভস ব্যবহার করতে পারলে ভাল হয় । আর আক্রান্ত কবুতরকে আলাদা করে রাখা।
২) পায়খানা ঠিকমত খেয়াল করা। সবুজ বা গাড় সবুজ ও সাথে সাদা মত অংশ থাকবে। তবে অনেকেই এই সবুজ অংশ কে উপেক্ষা করে খালি সাদা অংশ খেয়াল করে।
৩) সবুজ পায়খানা মানেই যে সাল্মনেল্লা টা ঠিক না অনেক খাবারের কারনেও পায়খানা সবুজ হতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
৪) সবুজ পায়খানা যদি করে আর খাওয়া দাওয়া ঠিক থাকে তাহলে কোন প্রকার অ্যান্টিবায়টিক প্রয়োগ না করাই ভাল। তবে প্রতিরোধ মুলক যে ব্যাবস্থা আছে টা গ্রহন করতে পারেন।
৫) এই রোগে আক্রান্ত হলে কোন প্রকার ভিটামিন দিয়া যাবে না।
৬) রোগ থেকে আরোগ্য লাভের পর অবশ্যই প্রবায়টিক দিতে হবে কমপক্ষে ২-৩ দিন এবং পরে লিভার টনিক বা মাল্টি ভিটামিন দিবার ব্যাবস্থা করতে হবে।
৭) এই রোগে অতিমাত্রার বা উচ্চ শক্তি সম্পন্ন অ্যান্টিবায়টিক ব্যাবহার করা ঠিক না।




৮) অনেকেই সবুজ হলুদ পায়খানা কে সাল্মনেল্লা এর লক্ষণ বলে ভুল করে ও এই ধরনের পায়খানাকে সাল্মনেল্লা মনে করেও চিকিৎসা শুরু করে কিন্তু এটি সাল্মনেল্লা এর লক্ষণ না সেটা মনে রাখবেন। আর সঠিক ভাবে রোগ নির্ণয় করার চেষ্টা করবেন।

 

মনে রাখতে হবে যে সাল্মনিল্লা প্রতিটি জিবন্ত প্রাণীর মধ্যে কমবেশি থাকে। তাই এটাকে নিয়ে তেমন চিন্তা করার কিছু নাই বা ভয় পাবার কিছু নাই। যদি আপনি এর সঠিক কারন জানেন ও এর প্রতিমাসে প্রতিরোধের ব্যাবস্থা করেন। তবে খেয়াল রাখবেন যেন এর মাত্রা যেন বেশী বেড়ে না যায়। যদি খাওয়া দাওয়া ঠিক মত করে তাহলে কোন প্রকার ঔষধ না প্রয়োগ করে প্রতিরোধক ব্যাবস্থা নিয়া উচিৎ।আর প্রতিকারের থেকে প্রতিরোধ ভাল। তাই নিয়মিত এই রোগের প্রতিরোধ চিকিৎসা করা উচিৎ ।

আজ এ পর্যন্তই। সকলেই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন এবং নিরাপদে থাকুন।

এই পোস্ট আপনাদের উপকারে আসলে একটি লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন। ধন্যবাদ...

Check Also

কবুতরের গোটা/পক্স/বসন্ত রোগের সহজ চিকিৎসা

কবুতরের গোটা/পক্স/বসন্ত রোগের সহজ চিকিৎসা

আজকে আমি কবুতরের যে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করব সেটা হল কবুতরের পক্স, বসন্ত বা মশার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *